জামায়াতে ইসলামীর আমির পদে নারা আসা নয় বলে জানিয়েছেন দলটির আমির ডা. শফিকুর রহমান। কাতারভিত্তিক সম্প্রচারমাধ্যম আল-জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এ কথা বলেছেন তিনি। গতকাল বৃহস্পতিবার আল-জাজিরার ইউটিউব চ্যানেলে সাক্ষাৎকারটি প্রচার করা হয়েছে।
‘বাংলাদেশ নির্বাচন: জামায়াতে ইসলামীর পুনরুত্থান’ শিরোনামে প্রচারিত সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন আল-জাজিরার সাংবাদিক শ্রীনিবাসন জৈন। সাক্ষাৎকারের ভূমিকায় তিনি বলেছেন, ২০২৪ সালের আগস্টে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকার পতনের পর এবং জাতীয় নির্বাচন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে জামায়াতে ইসলামী আবার আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে। সাম্প্রতিক জরিপের তথ্য অনুযায়ী, এই নির্বাচনে জামায়াত একটি বড় শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে।
আল-জাজিরার সাংবাদিক জামায়াত আমিরের কাছে ১৯৭১ সালের স্বাধীনতাযুদ্ধে তাদের ভূমিকা, ইসলামিক আইন চালুর বিষয়ে দলের অবস্থান, নারী, বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষ পরিচয় ও গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে জানতে চান।
নারীদের নিয়ে একটি প্রশ্নের জবাবে জামায়াত আমির জানান, এবার নির্বাচনে তাঁদের দল থেকে একজন নারীকেও মনোনয়ন দেওয়া হয়নি। তবে তাঁরা এ জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন। জামায়াতের প্রধান পদে নারী আসতে পারেন কি না, সে প্রশ্নের জবাবে শফিকুর রহমান বলেন, ‘এটি সম্ভব নয়।’ এর কারণ ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, আল্লাহ প্রত্যেককে তাঁর নিজস্ব সত্তায় সৃষ্টি করেছেন। একজন পুরুষ কখনো সন্তান ধারণ করতে পারবে না বা শিশুকে বুকের দুধ খাওয়াতে পারবে না। আল্লাহ যা সৃষ্টি করেছেন, আমরা তা পরিবর্তন করতে পারি না।’ এ প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, ‘কিছু ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা আছে, তাঁরা দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না। কিন্তু শারীরিক অসুবিধা আছে, যা আমরা অস্বীকার করতে পারি না। একজন মা যখন সন্তান জন্ম দেন, তিনি কীভাবে এই দায়িত্ব পালন করবেন? এটি সম্ভব নয়।’
জামায়াত ক্ষমতায় এলে দেশে ইসলামি আইন চালু করা হবে কি না, সে প্রশ্নের জবাবে শফিকুর রহমান বলেন, ‘যদি দেশের মঙ্গলের জন্য এটি অপরিহার্য হয়, তবে সংসদ এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে। এটি আমি নই, সংসদই বিষয়টি স্থির করবে।’ তিনি এটাও বলেন যে তাঁরা জনগণের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কিছু করবেন না।জামায়াতের উত্থান সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতার জন্য হুমকি হতে পারে বলে উদ্বেগ রয়েছে। রাজশাহী ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামী ছাত্রশিবিরের দুজন নেতা প্রকাশ্যে বক্তব্য দিয়েছেন ডল্লেখ করে এ বিষয়ে
প্রশ্নের জবাবে তিনি আরও বলেন, ‘ইসলামী ছাত্রশিবির আমাদের কোনো অঙ্গসংগঠন নয়; এটি জামায়াতের আইনি কাঠামোর অংশ নয়। মানুষ ভুল করতে পারে, তাকে সংশোধন করতে হবে। যদি তারা এটি পুনরায় করে, তবে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
দেশে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলায় জামায়াতে ইসলামীর যুক্ত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন দলটির আমির। প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘জামায়াতের কেউ কখনো এ ধরনের ভাঙচুর বা হামলায় জড়িত ছিল না। গত ১৫ বছরে যা-ই ঘটেছে, তারা জামায়াতকে দায়ী করেছে, কিন্তু আদালতে কোনো একটি মামলাও প্রমাণিত হয়নি। আগস্টের অভ্যুত্থানের পরের হামলা নিয়ে জাতিসংঘের রিপোর্টটিও আমি প্রত্যাখ্যান করছি। এগুলো সব মিথ্যা অপপ্রচার।’
১৯৭১ সালে বাঙালির ওপর চালানো নৃশংসতার ঘটনায় জামায়াতের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও অস্বীকার করেছেন দলটির আমির। সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘তৎকালীন জামায়াতের সিদ্ধান্ত ছিল একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, কোনো সশস্ত্র বাহিনীর সিদ্ধান্ত নয়। আমাদের নেতারা মনে করেছিলেন। ভারতের সাহায্যে পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হলে সেটি বাংলাদেশের ওপর ভারতের আরেকটি আধিপত্য তৈরি করবে।’ এ পর্যায়ে আল-জাজিরার সাংবাদিক জামায়াত-সংশ্লিষ্ট আধা সামরিক বাহিনীর হাতে বুদ্ধিজীবী হত্যার প্রমাণ থাকার কথা উল্লেখ করেন। তার জবাবে শফিকুর রহমান বলেন, সেই বাহিনীগুলো পাকিস্তান সেনাবাহিনী দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ছিল, কোনো সংগঠনের দ্বারা নয়। যদি কেউ অপরাধ করে থাকে, তবে স্বাধীনতার পর কেন তাদের বিরুদ্ধে কোনো মামলা বা জিডি (সাধারণ ডায়েরি) হয়নি? শেখ মুজিবুর রহমান নিজেও ১৯৫ জন যুদ্ধাপরাধীর তালিকা করেছিলেন, যারা সবাই ছিল পাকিস্তানি সেনা; এই ভূখণ্ডের কেউ নয়।’